হাট_বাজার_এবং_টুকরো_নাগরিক_যন্ত্রনা

।।তৃণময় সেন।।
রবিবারে এই আশেপাশে আর কোথাও বাজার বসে না বলেই শনিবারের এই বাজারটাকে পৌষ সংক্রান্তির শেষ বাজার বলা চলে। ক'বছর আগে হেমন্ত-শীতের প্রতি শনিবারে বিশাল ক্ষেতের মাঠ পেরিয়ে আশেপাশের গ্রামের অগুন্তি লোক পায়ে হেঁটে বাজারে আসতো। ফসল কাটার পরে সোজা দাঁড়িয়ে থাকা ঈষৎ হলুদ খড় ক'দিনের মধ্যেই লোকের পায়ের চোটে নেতিয়ে গিয়ে সোনালী উঠোনের মতো দেখা দিত দূরের পথচারীর কাছে। গরিব মানুষ নাকি কমে গেছে! আশপাশের লোকজন ছাড়া আজকাল আর পায়ে হেঁটে কেউ খুব একটা আসে না। তার বদলে মাথাপিছু দশ টাকা ভাড়া দিয়ে, পিচ ওঠা রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে, অটো-টেম্পোতে করে পৌঁছায় বাজারে। শেষ রাতের বৃষ্টিতে ধুলোর মোটা পরদ ধুয়ে আজ সবুজতা ফিরেছে পথের ধারের ছোট-বড় গাছের প্রাণে। তাতে কিছুটা ক্ষতিও হয়েছে, অনেকের উঠোনে মাড়াইয়ের জন্য পড়ে থাকা কাটা ধান ভিজে গেছে, এখন না শুকোলে মাড়াই করা যাবে না। শীতের দিনগুলোতে দুপুর যেন আসেই না। দিনের আদ্ধেকটা সকাল আর বাকি অর্ধেক বিকেলবেলা বলে ভ্রম হয়। বেলা এগারোটায় পূর্বদিকে হেলে থাকা সূর্যের আলো একপায়ে দাঁড়ানো ধ্যানগম্ভীর সুপুরিগাছের পাতায় পড়ে চকচক করে উঠছে। হাতের তালুর মতন ছোটছোট গর্তে জমা জল বহুজনের পায়ের নিচে পড়ে থকথকে কাদার রূপ নিয়েছে। নদী পেরিয়ে বাজারে প্রবেশ করার ছোট জংলী পথটিকে স্বীকৃতি দিলে এই বাজারে ঢুকবার মোট চারটে পথ। অটো-রিকশা-টোটো-সাইকেল-বাইক উত্তর আর পশ্চিম প্রবেশপথের একেবারে সামনে নিয়ে দাঁড় করানো যায়। বাকি দু'টো স্থানীয় লোকেরাই বেশি ব্যবহার করে।
তেলচিটকে গামছা মাথায় গোলমতন পাকিয়ে রেখে তার ওপরে গরম ক্রিমবনের টুকরি চাপায় জিতেন। এই ভিড়ের মধ্যে বেকারি থেকে বাজারের মাঝে নিজেদের দোকান ভিটেতে পৌঁছতে সাত-আট মিনিট লেগেই যাবে। তার ঠোঁটের উপর হালকা গোঁফের রেখা, পান-গুটখার নিয়মিত ব্যবহারে দাঁতগুলো বিশ্রী খয়েরি রঙের, গেঞ্জি-আকাশি হাফপ্যান্টে ময়দার সাদা ছোপ, বেকারির চুলোর তীব্র ঝাঁঝে গায়ের রং অকালে পুড়ে গেছে। জিভে জল আসা মতন গন্ধ ক্রিমবনের, কিন্তু ষোলো বছরের জিতেন গত কয়েকবছর থেকে ময়দা মেখে মেখে কোনো কিছুতেই যেন কোনো স্বাদ খুঁজে পায় না, তার স্বাদ অন্য কিছুতে। আর সেটার জন্যে সন্ধ্যে নামার অপেক্ষা করতে হবে। নদীপাড়ে বাঁশঝাড়ের আড়ালে অন্ধকার নামার সাথেই শুরু হয়ে যাবে সস্তা লাল-বাদামি পানীয়ের বিতরণ। বাজারের উপরি কামাইগুলো বেশ ক'মাস থেকে ওখানেই বিলিয়ে আসছে সে। প্রতিবারই নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, বড় অমোঘ নেশায় কখন যে ছুটে যায়... অথচ, ছোট বোনটি স্কুলে পড়ছে আর রান্নাঘরের খুঁটি আগামী বোশেখের ঝড় সামলাতে যে পারবে না, সেটাও বিচক্ষণ জানে জিতেন।
তেমাথাতে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অটোগুলো। চাকার চারপাশে লেগে আছে হালকা কাদার ছোপ। বাজারে নিয়ে আসা যাত্রীদের তাড়াতাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে নিজের অটো লাইনে দাঁড় করাচ্ছে সবাই। দশ টাকা ভাড়ার বদলে কেউ শ-দুশো টাকার নোট ধরিয়ে দিলে বিরক্ত হচ্ছে অটোওয়ালারা। সকালবেলা খুচরো দেওয়া বড্ড ঝামেলা! অগত্যা স্ট্যান্ডের আশপাশে চা-স্টেশনারি দোকানে গিয়ে খুচরো চাইতে হচ্ছে। এই বেলা লোক বাজারে আসছে বেশি, তাই যাবার বেলা সামনে দুজন আর পিছনে চারজন যাত্রীর ব্যবস্থা করতে পনের-কুড়ি মিনিট সময় লেগে যাচ্ছে অটোওয়ালাদের। পাকুড় গাছের নিচে সাইকেল রেখে বারকয়েক তালা পরখ করে ধীরপায়ে বাজারমুখো হলো ফরিদ। সারাটা পথ ধরে কি একটা বিশ্রী শব্দ করছিল সাইকেলটা। আগামীকাল চেন কভার খুলে একবার দেখতে হবে, বৃষ্টির জল হয়তো জমা হয়ে চেনের বারোটা বাজিয়েছে। গত দু-সপ্তাহ হাসপাতাল-বাড়ি ছোটাছুটিতে বাজার আসা হয়নি। শনিবারের বাজারে আক্ষরিক অর্থে তেমন কিছু কেনার উদ্দেশ্যে আসে আসে না ফরিদ। ভালো সাতকরা-লেবু-শুঁটকি সেরকম কিছু পেয়ে গেলে অন্য কথা.. বাজারের যেন একটা অদ্ভুত আকর্ষণ, যা প্রতি সপ্তাহেই তাকে টেনে নিয়ে আসে! কোনো কিছু ক্রয়-বিক্রয় ছাড়া দিব্বি কয়েক প্রহর বাজারে কাটিয়ে দিতে পারে সে। এসেই ঢুকে পড়ে পরেশদার হোটেলে। খড়ের ছাউনি দেওয়া ছোট একচালা হোটেল বাষট্টি বছরের প্রৌঢ় পরেশের। ছোট ছেলেকে সাথে নিয়ে দোকান চালায় সে। তাতে পকোড়া, ঘুগনি-পোলাও, পরোটা, চা সবই পাওয়া যায়। ব্যবসা, রাজনীতি, কৃষি থেকে শুরু করে সপ্তাহব্যাপী ঘটে যাওয়া ছোটখাটো ঘটনাগুলো আশেপাশের বিজ্ঞজন (!) সবিস্তারে বর্ণনা দেন দোকানে বসে। চা সহযোগে হাফপ্লেট পোলাওয়ে চামচ চালিয়ে সুগভীর জ্ঞান নীরবে আত্মগত করে ফরিদ। তারপর পায়ে পায়ে পুরোটা বাজার ঘুরে-ফিরে দেখে সে। ভালো কিছু সাধ্যমত পেলে কাঁধের গাঢ় সবুজ কাপড়ের ব্যাগে ভরে রাখে। অকালে সুগন্ধি পাহাড়ি লেবু পেয়ে পনেরো টাকায় দুটো কিনেছে আজকে। এই লেবু জরিনার বড় প্রিয়... এটা দিয়ে ভাত মেখে দু'গ্রাস খাওয়ানোর চেষ্টা করবে ওকে। ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে দু'দিন আগে ছাড়া পেয়েছে জরিনা.. হাতেগোনা দিন রয়েছে ওর কাছে। তাই লেবু দেখে আজকে আর দরদাম করতে যায়নি ফরিদ। বাজারের পশ্চিম মাথায় সুপুরিহাটির এক কোণে ঘন্টাখানেক সাধু ব্যাটার গান না শুনলে বাজার পরিক্রমা সম্পূর্ণ হয় না ফরিদের। উবু হয়ে বসে একমনে গান শোনে সে। আগে শুধু সারেঙ্গির সুরটাই তার মন ভোলাতো, কিন্তু আজকাল গানের কথা যেন সহজে আত্মস্থ করতে পারে ফরিদ। আধবোজা চোখ দুটো আকাশপানে করে সারেঙ্গি বাজিয়ে সহজ দেশীয় ভাষায় বাউলা-দেহতত্ত্বের গান শোনায় জন্মান্ধ সাধুব্যাটা। তার কাঁচাপাকা, ঢেউখেলানো, কাঁধছোঁয়া লম্বা চুল দুঃখমাখা গানের বিষণ্ণ সুরে আলতো করে নেচে ওঠে।
"বাইবে রাধারমন বলে রে,
গহুর মনেতে ভাবিয়া..
ও তুমার গনার দিন ফুরাইয়া গেলো,
তুমি কার বায় রইলায় চাইয়া রে..."
প্রতি তিন-চারটে গান গেয়ে কয়েক মিনিট দম নেয় তার সারেঙ্গি। খুচরো পয়সা সাধুর ঝুলিতে ঢেলে বাড়িমুখো হয় ফরিদ।
সংক্রান্তি শেষ হলে ঠান্ডা ধীর পায়ে পল্লীজীবন থেকে তার আসর গোটাবে। শীতের জড়তা কাটিয়ে প্রাকবসন্তের ছোঁয়ায় নবীনতা ফিরবে আকাশে-বাতাসে। প্রথম প্রেমের মতো সূর্যের সুমিষ্ট আমেজ ধীরে ধীরে দাম্পত্যের বিরক্তিকর ঝাঁঝে পরিবর্তিত হতে থাকবে, আর কুয়াশার সাদা চাদর ভাঁজ করে রেখে স্পষ্টতর হয়ে উঠবে জীবন। নীল আকাশে আজ হালকা ওড়নার মতো সাদা মেঘের ছোপ। অনিশ্চয়তার দোলাচলে থাকা বাসন্তী ছয়-বাই চারের ভিটেতে বসার আগে নীল ত্রিপালের চার পাশে দড়ি বেঁধে রেখেছে। ওর চিঁড়ে-মুড়িতে একফোঁটা জল পড়ে গেলে আর উপায় নাই, খুব তাড়াতাড়ি খারাপ হয়ে যাবে। শীতের কয়েকটা মাস একটু শান্তি ছিল, আকাশ ঝরতে শুরু করলেই মুড়ির ব্যবসা করা ভীষণ মুশকিল হয়ে পড়ে মোহনপুরের বাসন্তী সিনহার কাছে। রুমিকে দোকানে বসিয়ে রেখে পলিথিন ব্যাগ আনতে নৃপেনের খোঁজে বেরিয়ে পরে বাসন্তী। অনিচ্ছা সত্ত্বেও খোলা বাজারে মেয়েকে বসিয়ে আসতে হল.. নৃপেনটা সকাল হতে বেপাত্তা, তার ফোনও লাগছে না। মাত্র সাত-আটটা পলিথিন পড়ে আছে বাসন্তীর কাছে। এইগুলো শেষ হয়ে গেলে কাস্টমারকে মুড়ি কিসে করে দেবে! এটা তো আর আলু-ফুলকপি-বেগুন না যে সোজা ব্যাগে ভরে দেওয়া যাবে। নৃপেনকে একান্ত না পাওয়া গেলে পাশের দোকানের মুদি হরেনদাই ভরসা। বাসন্তীর দু'চোখ খোঁজে চলে নৃপেনকে। উচাটন মন বিরক্তিতে ভরে উঠছে.. ওদিকে রুমি একা! ওকে একা দেখে ছেলে-ছোকরারা এমনি এমনি চিঁড়ে মুড়ির দাম জিজ্ঞেস করতে আসবে, কিছুই কিনবে না অথচ ভিড় করবে দোকানের সামনে। অষ্টাদশী মেয়ের সাথে পুরুষরা ভাব জমাতে চাইবে এটাই তো স্বাভাবিক! তার ওপরে নিরুদ্দেশ বাপের এই মেয়ে বাপের মতনই লম্বা, মোমের মতন তার গায়ের রং, চোখদুটো মায়াময়, সে হাসলে বাসন্তীর মনে হয় এই বুঝি ওর নিজেরই নজর লেগে যাবে। ওর জন্য বেশ কয়েকটি বিয়ের সম্বন্ধ ইতিমধ্যেই এসেছে, কিন্তু উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার আগে বিয়ের ব্যাপারে মা-মেয়ের একই মত। তাই বিয়ের প্রসঙ্গে কথা উঠলে গ্রামের কৌতূহলী মানুষকে সহজেই এড়িয়ে গেছে বাসন্তী। এই তো পক্ষকাল আগে একটা ভালো আলাপ এসেছিল। ছেলের কাকু ভৈরব বাবার আশ্রমের বাৎসরিক ষোল প্রহর কীর্তনে এই মেয়েটিকে শুধু এক ঝলক দেখেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে নতুন চাকরি পাওয়া নিজের ভাইপোর জন্য আলাপ নিয়ে বাসন্তীর ভাঙা বাড়িতে এসেছিলেন। ওদের দাবিদাবা কিছু ছিল না, তবুও নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অনড় থেকেছে বাসন্তী। আর সেইজন্যে আশপাশের মানুষ খোঁচা দিয়ে বিস্তর কথাও শুনিয়েছে তাকে। ভেজা চোঁখে মাকে জড়িয়ে ধরেছিল রুমি। আশপাশে একটা ভালো ছেলে পেলেই হলো, বেশি টাকা-পয়সাওয়ালা জামাই চাই না তার.. ওই তো বড় ব্যাগ ভরে দোকানে দোকানে পলিথিনের বান্ডিল বিলিয়ে এগিয়ে আসছে নৃপেন। তাকে দেখে চলার গতি বাড়িয়ে দেয় বাসন্তী।
যাদের বাজারে স্থায়ী ভিটে নেই, সংক্রান্তির বাজারে তারা অনতিদূরের ক্ষেতের মাঠে রকমারি জিনিসপত্র নিয়ে বসে। বিরোইন-কালোজিরে চাল, নানা সাইজের বাঁশের টুকরি, গুড়, চুঙ্গাপিঠের বাঁশ এইরকম জিনিস যা সচরাচর বাজারে ওঠে না, সেইগুলো সবই এই বিশেষ বাজারে পাওয়া যায়। শিলং থেকে কিছু ব্রকলি আমদানি করে বাজারে নিয়ে এসেছে একজন সবজিবিক্রেতা। দেহাতি লোকেরা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখে যাচ্ছে এই আজব সবজিকে। এত্তো সবুজ ফুলকপি জীবনে দেখে নাই। ওটার নিচের দিকটা ফুলকপি থেকে একটু বেশি লম্বা মতন। নাহ, এটাকে তো ঠিক ফুলকপি নয়! একজন তো বলেই দিল "ইতা কচুয়া ফুল্গবী খাইয়া মানু মরবা রেভো!!" ধান কাটার কাঁচি থেকে সাইজে হালকা বড় দা নিয়ে খুব সন্তর্পনে বাঁশগুলি সাইজ করে চলছে মনুয়া তাঁতি। সকালবেলা অনেকক্ষণ ধরে নদীর পাড়ে পাথরে ঘষে দা'কে ক্ষুরধার করে নিয়েছে সে। চুঙ্গাপিঠার বাঁশ ভারী দা দিয়ে কাটতে গেলে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সকাল থেকে খুব একটা বিক্রি না হলেও এইসব জিনিস বিকেলবেলা ভালোই বিক্রি হয়। ব্যাগ থেকে খাবার বের করে আলু-ফুলকপি ভাজা দিয়ে পেট ভরে ভাত খেয়ে নেয় মনুয়া। পাহাড় থেকে বাঁশ আনতে সারাদিন লেগে যায়। ভোরবেলা বেরোলে সন্ধ্যের আগে বাড়ি ফিরে আসা যায় না। পাহাড় থেকে নেমে নদীপথে কখনো বাঁশের ভেলা বানিয়ে ওপরে বসে, আবার কম জল হলে টেনে নিয়ে এগোতে হয়। এইবার প্রায় দু'হাজার টাকার মাল নিয়ে এসেছিলো সে। কয়েকখানা ভেঙে না গেলে সংক্রান্তিতে ভালোই রোজগার হত। পাঁঠাজোড়া নয় বছরের ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ছাগলহাটিতে পাঠিয়েছে। ক্রেতা জোরাজোরি করলে নির্ধারিত দামের দু'শো টাকা অবধি কম করতে শিখিয়ে দিয়েছে ছেলেকে। দেখা যাক কি দাম পাওয়া যায়! এই শীতের মরশুম কেটে গেলে এইবছর কি করবে, তা ভেবে দেখেনি মনুয়া। ভালো কিছু না পেলে দিনমজুরের কাজই সই... কিন্তু নিয়মিত দিনমজুরদের মতো তো এতো কাজ পাবে না সে। অনিয়মিতভাবে কাজ করলে এটাই মুশকিল.. মাঘ মাস থেকে আবার বিয়ের মরশুম শুরু হয়ে যায়। এইক্ষেত্রে বিজয়দার সাথে একবার কথা বলে দেখতে পারে। ওনার টেন্ট হাউসে এই সময়টাতে বাসন ধোওয়া, কাপড় কাঁচা, গাড়ি থেকে মাল লোড-আনলোড করার জন্য বাড়তি লোকের দরকার হয়।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাজারে ভিড় বাড়ছে। বাইক-গাড়িওয়ালা ক্রেতাদের সংখ্যা বেশি। অনেকের মুখে মুখে ঘুরছে সংক্রান্তির বাজারে মাছের দামের বিষয়টা। ইলিশ-বোয়াল-আড়-পাবদা সবগুলোরই কিলো হাজার টাকার আশেপাশে। এতো দাম হওয়া সত্ত্বেও ভালো মাছ নিমিষে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে আসা বড়লোকেরা সোজা এসে মাছের বাজারে ঢুকে যাচ্ছে। উৎসবের মরশুমে সচরাচর মধ্যবিত্তরাও তো বেশি হিসেব করতে পছন্দ করে না, তা হলে লাউগুলো অনেকক্ষণ থেকে কেন পড়ে আছে রাসুর! আসার পরে যে ক'খানা বিক্রি হয়েছিল, তার পরে আর কেউ কিনছে না। শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চলে যাচ্ছে। আজকে অবশ্য একটু অধৈর্য্য হয়ে পড়েছে রাসু, বেলা দু'টো বাদে বাজারে এসে সব লাউ বিকে যাবে এই আশাটা একটু বাড়াবাড়িই! লোকে জিনিসপত্র নিয়ে সেই সকাল থেকে বসে আছে। দুঘন্টায় যে চার-পাঁচটা বিক্রি হয়েছে সেটাও সংক্রান্তির বাজার না হলে হতো না! পাশে বসা কমলাওয়ালার কথা নীরবে সমর্থন করে রাসু। সকালে আসতে চাইলেও সেটা আজকে সম্ভব ছিল না। ভোরে উঠে প্রথমে ধান কাটতে গেছে। পেকে যাওয়া রঞ্জিত ধান বৃষ্টিতে ভেজার পর রোদের ছোঁয়া পেলে বাকি অন্য ধানের তুলনায় তাড়াতাড়ি ঝরে পড়ে যায়। বৃষ্টি শেষে সূর্যের প্রচ্ছন্ন আলো তাই গোদের ওপর যেন বিষফোঁড়াসম। শেষ রাতে বৃষ্টি টের পাবার পর আর দু'চোখের পাতা এক করতে পারেনি রাসু। রাতের আঁধার কাটার আগেই বেরিয়ে পড়েছিল মাঠের উদ্দেশ্যে। অন্যান্য বছর পৌষের মাঝামাঝিতেই ধানকাটা হয়ে যায় তার। এবার এনআরসি-তে নাম না আসায় এই মোক্ষম সময়টাতে শিলচর-বাড়ি অনেক দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে রাজেশ সূত্রধর ওরফে রাসুকে। এনআরসি-তে নাম না আসার খবর পাওয়ার পর শুরুর দিনগুলোতে পুরোটা পরিবার আতঙ্কে-ভয়ে দিন গুজরান করেছে। কিন্তু ব্যাপারটা রটে যাওয়ার পর অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। শিলচর কোর্টে গেলে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এগিয়ে এসেছে, অভয় দিয়েছে তাকে। মিছেমিছি আতঙ্কিত হয়ে আত্মঘাতী হওয়ার মতো হটকারী কিছু না করতে বুঝিয়ে বলেছে। কাঠমিস্ত্রি কাকার হাত ধরে কাজের সন্ধানে এই দেশে যে কবে এসেছিল, সেই সালটা হিসেব করে মেলাতে পারে না রাসু, চোখ ঝাপসা হয়ে আসে তার।
--ইগু কত রেবা!
সামনে একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি, মাথায় টুপি পড়া মৌলবির আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পায় রাসু। সকালবেলা হলে যে লাউটার দাম অন্ততঃ পঞ্চাশ টাকা হত, সেটাকেই সোজা চল্লিশ বলে উঠলো সে। দাম শুনে মৌলবী সাহেব তুলনায় ছোট একটা লাউয়ে হাত দেন।
-- দুইটা নেইনগি মেছাব, ষাইট টেকা দিলাইবা।
কমলাওয়ালার প্রস্তাব মন্দ ঠেকে না মৌলবী সাহেবের কাছে। রাসুর দিকে এক'শ টাকার নোট বাড়িয়ে দেন। রাসুর সরল চোখে কৃতজ্ঞতা ফুটে ওঠে কমলাওয়ালার প্রতি।
দূরের আকাশে লাল সূর্য অস্তাচলে পাড়ি দেওয়ার প্রাকমুহূর্তে সমস্ত তেজোত্তাপ খুইয়ে জ্বলন্ত বলের মতন দেখাচ্ছে... তার রক্তিম আভায় প্রভাবিত হয়ে উঠেছে দিগন্তের আকাশ। পাখিরা ফিরছে নিজস্ব নীড়ে.. একটা বাছুর শেষবেলার সোনালী আলো গায়ে মেখে শুকনো খড়ে ছপছপ শব্দ ফেলে মায়ের পিছন পিছন ছুটে চলছে গোয়ালঘরের উদ্দেশ্যে। সূর্যের উষ্ণতা ক্ষীণ হতেই বাতাসের হিমেল ভাবটা তীক্ষ্ম হয়ে উঠছে। তার প্রকোপ থেকে বাঁচতে অনেকেই মাফলার-টুপি দিয়ে ঢাকছে নিজেকে। দূরের মাঠে কুয়াশা অবাধ সাম্রাজ্য অচিরেই গড়ে তুলেছে। সওয়া মাইল আগের ইলেকট্রিক খুঁটিগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তার মায়াবী আঁচলে। সাইকেলওয়ালারা সামনে ব্যাগ ঝুলিয়ে অনবরত বেল বাজিয়ে, পাশ কাটিয়ে সন্তর্পনে এগিয়ে চলছে। যাত্রীরা বাড়িমুখো হওয়ায় চার-পাঁচ মিনিটে ফুল প্যাসেঞ্জার পেয়ে যাচ্ছে অটোওয়ালারা। ব্যাগভর্তি প্যাসেঞ্জার কোনোমতে আঁটোসাঁটো হয়ে কোলের ওপর ব্যাগ রেখে বসছে। যাত্রী ভরতে টেম্পোওয়ালারাও পিছিয়ে নেই। বার বার হর্ন বাজিয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে যাত্রীদের। জিনিসপত্র বেশি হলেও অসুবিধা নেই, পিছনের সিটে বসিয়ে দিচ্ছে। চালকের সহযোগী বারো-তেরো বছর বয়েসী ছোকরাটা অনবরত গন্ত্যেবের নাম ডেকে চলছে। যাত্রী গাড়িতে বসলে তার ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে দিচ্ছে। একজনের চোঙাপিঠের বাঁশ জোর করে সিটের নিচে ঢোকাতে দিয়ে বেদম ঝাড় খেয়েও হাসিমুখে আবার চেঁচিয়ে চলছে। সন্ধ্যেবেলায় ছুঁচোলো হাওয়াকে টেক্কা দেওয়ার জন্য তার নোংরা হাফ শার্টই যথেষ্ট!
শীতের দিনগুলোতে সূর্য ডুবতেই আঁধার নেমে আসে। এই সময়টাতে সন্ধ্যে বড়োই ক্ষণস্থায়ী! গ্রাম্য জীবনে শীত যেন কেটেও কাটতে চায় না। এই অকাল বৃষ্টি এবার শীতের মেয়াদ আরেকটু বাড়িয়ে দিল বোধহয়! চরাচরে আঁধার নেমে গেলেও কেরোসিন ভরা বাঁশের মশালের কাছে কিছুটা দমে গেছে। অন্য শনিবারের মতো আজকে আর আকণ্ঠ পান করেনি জিতেন। বারবার বোনটার চেহারা চোখে ভাসছে। অঘ্রানের শুরু থেকেই ভাইয়ের কাছে উলের কুর্তি বায়না করে যাচ্ছে.. বিক্রি না হওয়া তিলুয়ার বাক্স মাথায় করে এনে দোকানে রাখলো সে। পকেটে থেকে বের করলো আজকের বোনাস কমলা নোটখানি। সংক্রান্তির বাজার সেরে পঞ্চাশ টাকা বেঁচেছে। আড়াইশ টাকায় কি কুর্তি পাওয়া যাবে! দোকান থেকে বেরিয়ে আবার দৌড় দিল বাজারের উদ্দেশ্যে।
বিক্রিবাট্টা শেষে মা-মেয়ে মিলে বড় সাদা সিমেন্টের বস্তায় সব কিছু ভরে নিয়ে টেম্পোর পিছন দিকে বসেছে। বিড়ি-মদের গন্ধে দমবন্ধ করা পরিবেশে নাকে কাপড় চাপা দিয়ে বসেছে বাসন্তী, মেয়ে ওড়না দিয়ে মুখ-মাথা বেঁধে রেখেছে, দু'চোখ ছাড়া মুখের সমস্তটাই ঢাকা। সামনে আধবুড়ো একটা লোক একদৃষ্টে চেহারা পরখ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পা-টা ইচ্ছে করেই সামনের দিকে এগিয়ে রেখেছে। সামনে আরও দুজন প্যাসেঞ্জার না বসালে ছাড়বে না টেম্পো। ভাঙা রাস্তায় বাড়ি যেতে কুড়ি মিনিট লেগেই যাবে। ক্রমশ এগোতে থাকা বুড়োর পায়ে ইচ্ছে করেই শক্ত প্লাস্টিকের চপ্পল দিয়ে জোরে চাপ দেয় বাসন্তী। একপ্রকার চাপা আর্তনাদ করে তাড়াতাড়ি পা সরিয়ে নেয় লোকটা। টাইট করে রুমির হাত ধরে বসে থাকে সে, মায়ের কাঁধে ক্লান্তিতে মাথা হেলিয়ে দেয় রুমি।
কাঁধে একখানা লাউ নিয়ে খালি পায়ে মাঠ পেরিয়ে চলছে মনুয়া। হাতের ব্যাগে শার্ট দিয়ে পেঁচিয়ে রেখেছে টাকাগুলো। বাজার থেকে বেরিয়ে বিশাল ক্ষেতের মাঠ, আর সেই মাঠখানি যে টিলার গা ছুঁয়ে শেষ হয়েছে সেই টিলায় তার বাড়ি। বাজারে আসবার জন্য ইএনডির বদলে মাঠের আল বেয়ে বাজারে যাওয়া পছন্দ করে লোকে। ফসলহীন মাঠে আর আল ধরে যেতে হচ্ছে না, তাই ছেলের কৌতূহলভরা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে স্বচ্ছন্দ্যে পথ পেরোতে থাকে বাবা-ব্যাটা। নগ্ন পায়ে কখনো ভেজা খড় তো কখনো নরম পলি মাড়িয়ে চলে তারা। কুয়াশায় চাদর আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে, তা ভেদ করে এক-তৃতীয়াংশ চাঁদের আলো নিতান্তই আবছা কিন্তু পরিচিত পথ চলতে তা না হলেও বিশেষ অসুবিধা হতো না মনুয়াদের। ডান-বাঁ করে কাঁধ বদলে লাউ নিয়ে আবার হাঁটার গতি বাড়ায় মনুয়া, বাপের সাথে তাল মেলাতে দৌড়তে থাকে ছোট্ট কানু। তার প্রাণবন্ততার কাছে হেরে যায় ক্লান্তির অলস ছোঁয়া।
শেষের লাউগুলো জলের দামে দিয়ে দিয়েছে রাসু। গাছে থেকে থেকে কয়েকটি এমনিতেই বুড়ো হয়ে যাওয়ায় বিশেষ আফসোস নাই তার। মঙ্গল-শনি নিরামিষ, তাই মাছবাজারের দিকেও আর পা বাড়ায় না সে। মুদির দোকান থেকে এক গোল্লা সাবান, মুসুর ডাল আর বেকারি থেকে তিল-বাতাসা-গুড় আর এক পোয়া খুরমা নিয়েছে। সামান্য অকাল বৃষ্টির প্রভাব নদীর জলে পড়েনি বললেই চলে। হাঁটুজল সামান্য ঘোলাটে হয়েছে শুধু। প্যান্ট গুটিয়ে নিয়ে ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে নদী পার হয় রাসু। বাজার-টাজার করে সত্তরটা টাকা পকেটে আছে। এতো দৌড়াদোড়ি করে এখন শোনা যাচ্ছে যে এনআরসি-তে নাম না আসলেও অসুবিধা নেই! এতোটা বছর থাকার পর এখন কি যে হলো মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারে না, অস্তিত্বের লড়াই লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সে। বাঁকা চাঁদ, মিটিমিটি তারা, বৃষ্টি-কুয়াশার সংমিশ্রণে অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। বাজারবেলা শেষ, চারদিকে বিরাজ করছে নিস্তব্ধতা। কাল বাদ পরশু পৌষ পার্বণ..কোথা থেকে তিলের নাড়ুর গন্ধ ভেসে আসে।

Comments

Popular posts from this blog

#শ্মশানবন্ধু

ছোঁয়া